পূর্বে প্রকাশের পর…
গারো পাহাড়ে বালশ্রীগিত্তিম গ্রামে বাস করতো সেরেনজিং-এর মেসো মাসি ছিল তার মায়ের আপন ছোট বোন, নাম নোরেং, আর মেসোর নাম সিমরেং তারা ছিল নিঃসন্তান। বালশ্রীগিত্তিম গ্রামে সেরেনজিং এর আর দুই মামা ও থাকতো। একজনের নাম সাংওয়ান আর আরেক জনের নাম মাংওয়ান। সেরেনজিং সেরেনীর মতই পিতৃ-মাতৃহীন একযুবক মনের দুঃখে পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। নাম ওয়ালজান। ভাল চেহারা সুঠান দেহ। ঘুরতে ঘুরতে একদিন বালশ্রীগিত্তিম এলাকার পাহাড় জঙ্গলে মনের দুঃখে গান শুরু করে।
“জেরুং মাতব্রু দংজা আংমিং সে.সানা
মিচিচয়াকোন আংনাদে রে.য়েন বিমাং নামজানা।”
বাংলা:
নিঃসঙ্গ একা আমি কেউ কাছে আসে না
ঘৃণায় হয়তো বন্য জন্তু আমার কাছে ঘেঁষে না।”
তখন সকাল বেলা সিমরেং ও নোরেং লাকড়ি কাটতে গিয়েছিল জঙ্গলে। কাছের জঙ্গলে ওয়ালজানের এমন কষ্টের গান শুনে স্বামী স্ত্রী সেদিকেই যাচ্ছিল। এমন সময় বাঘের গর্জন আর মানুষের চিৎকার শুনে তারা পালাতে উদ্যত হল। সিমরেং একটি গাছের আড়ালে থেকে দেখলো একটি যুবক বাঘের সাথে লড়ছে। ব্যাপার দেখে সিমরেং এর মনে সাহস হল। বাঘ থেকে ঐ যুবকটিকে বাঁচানোর জন্য তারা সেখানে তাড়াতাড়ি ছুটে গেল। ওয়ালজান তাদের দেখে সাহস পেলো। সিমরেং নোরেং বর্শা ও কুড়াল দিয়ে বাঘটিকে আঘাত করল। অবশেষে বাঘ ছুটে পালাল। ওয়ালজানও রক্ষা পেল। সিমরেং নোরেং ওয়ালরানের বীরত্ব দেখে খুব মুগ্ধ হল। তার পরিচয় জানতে চাইলে ওয়ালজান সবিনয়ে বলে, আমার বাড়ি খাসিয়া পাহাড়ে। মা-বাবা মৃত্যুর পর বনে বনে ঘুরি আর লোকালয় খুঁজি আমার নাম ওয়ালজান। নোরেং সিমরেং ঐ ছেলেটার পরিচয়ে খুব খুশি হয়। বলল “বাবা তুমিই আমাদের ছেলে। বিধাতা আমাদের কোনো সন্তান সন্ততি দেয়নি। আজ থেকে তুমি আমাদের বাড়ি থাকবে। তোমাকে আমরা ছেলের মত করেই রাখব। ওয়ালজানও এ প্রস্তাবে খুব খুশি হয়। অনেকদিন পর মায়ের আদর পেয়ে সে নোরেংকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। নোরেং সিমরেং খুশি মনে ওয়ালজানকে নিয়ে বাড়ি ফেরে।
এদিকে সেরেনজিং মায়ের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আগন্তুকরা বালশ্রীগিত্তিম গ্রামে এসে উপস্থিত হল। তখন দুপুর বেলা। নোরেং সিমরেং ও বাড়িতেই ছিল। আগন্তুকদের মুখে বড় বোনের মৃত্যু সংবাদ শুনে নোরেং হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল। নোরেং এর কান্না শুনে আশপাশের সবাই এসে ভীড় জমালো। সেরেনজিং এর মামা মাংওয়ান ও সাংওয়ান ও ছুটে আসলো বোনের বাড়ি। সব শুনার পর তারা সবাই ছুটে চললো খাসিয়া পাহাড়ের দিকে। সাথে চলল পথ প্রদর্শক হয়ে সেই আগন্তুকদ্বয় ওয়ালজানকে বাড়িতে রেখে ওরা চলে গেল। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই সেরেনজিংদের বাড়ি গিয়ে পৌছল সবাই। টিম টিম করে ঘরে আলো জ্বলছে। মৃত মাকে ঘিরে ক্লান্ত দেহে দুবনে কী যেন কী ভাবছে। এমন সময় বাইরে জনরব শুনে ওরা উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণ সবাই এসে গেছে ঘরের কাছে। মৃত বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করল মাসি নোরেং ও তার দু মামা। সিমরেং সেরেনজিং ও সেরেনীকে আদর করে সান্তনা দিয়ে বলে, কেঁদনা বাছারা আমি তোমাদের মেসো। তোমাদের বাবা নেই। আজ থেকে আমিই তোমাদের বাবা। আর তোমাদের মাসি নোরেং আজ থেকে তোমাদেরই মা। আর তোমাদের দু মামাতো আমাদের কাছেই থাকে।
অনেক্ষণ কান্নাকাটির পর ধীরে ধীরে সবাই শান্ত হল। অতঃপর রাতে পাহাড়ের নিচে সেরেনজিংয়ের মৃত মাকে দাহ করে ওরা সবাই আবার সেরেনজিংয়ের বাড়ি আসে। দু মামা সেরেনজিং ও সেরেনীকে তাদের সাথে বালশ্রীগিত্তিম যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলে। সেরেনজিং কান্নায় ভেঙে পড়ে। কী করে তারা মায়ের ভিটাবাড়ি ফেলে চলে যাবে! মামাকে জড়িয়ে ধরে সেরেনজিং কেঁদে বলে-
“রিজা মামা চিংআদে আমানকখো ওয়াত্তিদে
আবিসা সাকগ্নি রুয়েগিন্নি চিংআদে”
বাংলা
মায়ের ভিটাবাড়ি ছেড়ে কেমনে যাবো চলে
থাকবো মোরা সুখে দুখে দুবনে মিলে।”
অবশেষে সবাই সেরেনজিং ও সেরেনীকে সাথে নিয়ে বালশ্রীগিত্তিম এর পথে যাত্রা শুরু করে। সারারাত একটানা পায়ে হেঁটে সকাল বেলা তারা বালশ্রীগিত্তিম গ্রামে এসে পৌছে।
সিমসাং (সোমেশ্বরী) নদীর পাড়েই নোরেং সিমরেং এর বাড়ি। তাদের পরিবারে ওয়ালজাম এখন তাদের ছেলে। ওয়ালজাম নোরেংকে মা এবং সিমরেংকে বাবা ডাকে। এখন প্রতি দিন সে জংগলে চলে যায় গাছ কাটতে কোনদিন জুমক্ষেত। আশেপাশের দু একজন পাড়া প্রতিবেশীর সাথে এখন ওয়ালজানের ভাব হয়েছে। ওরা সাবাই ওয়ালজানের বীরত্বে মুগ্ধ। বিকেলে সিমাসং নদীতে স্নান করতে যায় দু বোন সেরেনজিং ও সেরানী। নতুন জায়গায় এসে নতুন পরিবেশ ও কিছুটা পরিবর্তীত হতে লাগল। মাসির আদরে বেশ শান্তি পেলো। ওরা নদীতে স্নান করতে এসে হঠাৎ মার কথা মনে পড়ে সেরেনজিংয়ের। ছোট বোনের চোখের আড়ালে সে নীরবে চোখের জল ফেলতে শুরু করে। এক সময় দিদির চোখে জল দেখে সেও কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেদিন ওয়ালজাম পাহাড়ের জুমক্ষেতে গিয়েছিল। বিকেলে ফিরছিল সিমসাং নদীর কূল ঘেষে। সেরেনজিং ও সেরানীর কান্না শুনে সে নদীতে নামলো এদের এমন অবস্থা দেখে ওয়ালজানের খুব মায়া হল। সেরেনজিং এর কাছে এসে আদর করে তাকে প্রশ্ন করলো তুমি কে? সেরেনজিং শান্ত কথায় উত্তর দেয়,
“আমাখোদে চিনারাং আফাখোদে সালনারং
আপফা বিমুং মিংফারা আংখো মিংআ সেরেনজিং।”
বাংলা
মায়ের নামটি চিনারাং বাবার নামটি সালনারাং
আদর করে ডাকতো তারা আমার নামটি সেরেনজিং।”
চলবে…
কভার প্রচ্ছদ : শিল্পী তিতাস চাকমা
‘লেখক অভিধান : পরাগ রিছিল’
: পরাগ রিছিল কবি-গবেষক-সংস্কৃতিকর্মী জন্ম : ১৯৮১ সালের ৩ জুলাই জন্মস্থান......বিস্তারিত
-
ধরাতী গ্রামে রংচু গালা অনুষ্ঠিত
: ২০২৫ সালের প্রথম রংচু গালা ধরাতী গ্রামে শুরু হয়েছে। গত...
-
প্রণব নকরেক-এর দুটি কবিতা
: অভিশপ্ত সিসিফাস আষাঢ়ে ভেজা পথ হাঁটছি একা মিলছেনা অবসর ক্লান্তিতে...
-
আজ লেখক ও গবেষক সুভাষ জেংচামের জন্মদিন
: গারো জাতিসত্তার বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুভাষ জেংচামের আজ জন্মদিন! থকবিরিম...
-
Ku’bibal ।। Dama।। Liang Ritchil
: Dama Liang Ritchil Rangri mandal gambari, Oe ku•monggrike dongari; Nokma...
-
লেখক অভিধান : পরাগ রিছিল
: পরাগ রিছিল কবি-গবেষক-সংস্কৃতিকর্মী জন্ম : ১৯৮১ সালের ৩ জুলাই জন্মস্থান...
-
নিগূঢ় ম্রং-এর দুটি কবিতা
: অদ্ভুত নেশা —————– খোঁপায় বুনোফুল লাল টকটকে দকমান্দা পড়া উদাসী...
‘ধরাতী গ্রামে রংচু গালা অনুষ্ঠিত’
: ২০২৫ সালের প্রথম রংচু গালা ধরাতী গ্রামে শুরু হয়েছে। গত......বিস্তারিত
‘লেখক অভিধান : পরাগ রিছিল’
: পরাগ রিছিল কবি-গবেষক-সংস্কৃতিকর্মী জন্ম : ১৯৮১ সালের ৩ জুলাই জন্মস্থান......বিস্তারিত



ধরাতী গ্রামে রংচু গালা অনুষ্ঠিত
প্রণব নকরেক-এর দুটি কবিতা
আজ লেখক ও গবেষক সুভাষ জেংচামের জন্মদিন
Ku’bibal ।। Dama।। Liang Ritchil
লেখক অভিধান : পরাগ রিছিল
নিগূঢ় ম্রং-এর দুটি কবিতা












