Thokbirim | logo

৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত : রে রে ।। পর্ব-১।। মতেন্দ্র মানখিন

প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০২০, ১০:৪৫

গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত : রে রে ।। পর্ব-১।। মতেন্দ্র মানখিন

ড. কাজী দীন-মুহম্মদের উক্তি মতে ‘জাতীয় সংস্কৃতির যেসব সাহিত্যিক ও মননশীল সৃষ্টি মুখ্যত মৌখিক অনুস্মরণ করে এগিয়ে যায়, তাই লোক সাহিত্য। যেমন গীতিকা, কথা সঙ্গীত, ধাঁ-ধাঁ, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদি। তাই এ হলো কোনো দল বা সম্প্রদায়ের অলিখিত সাহিত্য।

লোক সাহিত্যের ধর্মই হল তার সজীবতা। এর ধারা ক্রম-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। মৌখিক আবৃতি ও পরিবর্তনের  ভিতর দিয়ে এর জীবনী শক্তি রক্ষিত হয়। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের বন্ধনে আবদ্ধ হলে এর গতি হয়ে যায় রুদ্ধ আর প্রাণ শক্তি হয়ে যায় লুপ্ত। অতএব, চলমান সমাজের গতি ধারার সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে চলে এ সব লোক সংস্কৃতির বাহনে নতুনত্ব এনে আবার পুরানো হয়ে যায়। এতে আমরা প্রথম সৃষ্টির রস-মাধুর্য থেকে বঞ্চিত হই বটে, কিন্তু চলিষ্ণু সমাজের জীবন্ত চিত্র দেখে মুগ্ধ হই সমাজের গতি দেখে চকিত হই, নিজেকে চিনি। এদিক থেকে লোক সাহিত্য সমাজের যে ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে তার গতি চিরন্ত আর তার প্রকৃতি লীলাময়।

বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সমাজের লোক সাহিত্যের প্রকৃতি বিভিন্ন। কিন্তু এ পার্থক্যের মধ্যেও একটা ঐক্যসূত্রে বিভিন্ন দেশের লোক সাহিত্যকে এক শ্রেণিভূক্ত করেছে। জীবন্ত সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে যে মানস প্রতি ফলনের মাধ্যমে ক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় সে প্রতি ক্রিয়াই লোক সাহিত্যের প্রাচীননত্ব ঘুরিয়ে দিয়ে তাকে নতুন সাজ পরায় আবার তারই মধ্যে আপন সত্ত্বা রক্ষা করতে পেরে লোক সাহিত্য সংস্কৃতির মুখ বন্ধ হিসেবে চলে, সে সমাজের পরিচয় বহন করে।

এক এক দেশের চাল-চলন, রীতি-নীতি যেমন বিভিন্ন তার  আকাশ বাতাস, ক্ষেত খামার কাজ-কর্মও তেমনি ভিন্ন, সে পেরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি বলে সে দেশের জাতির বা সমাজের ইতিহাস তথা সংস্কৃতির রূপও বিভিন্ন। লোক সাহিত্যর স্বরূপ তাই বিভিন্ন হতে বাধ্য। একই দেশে বসবাস করলেও ভাষা, চাল-চলন ও সামাজিক রীতি-নীতির পার্থক্যের দারুণ বাংলাদেশি গারো আদিবাসীদের সংস্কৃতির রূপ সেই কারণে ভিন্ন। লোক সাহিত্য মানব সংস্কৃতির এক মূল্যবান সম্পদ।

পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিকাশে লোক সাহিত্যের অবদান রয়েছে। যে কোনো জাতির স্মৃতি সম্ভার পরীক্ষা করলেই আমরা অনেক উপখ্যান. ধাঁ-ধাঁ, প্রবাদ প্রবচন ও সঙ্গীতের সন্ধান পাই। তাই লোক সাহিত্য অস্বীকার করে কোনো জাতির সংস্কৃতিকে বিশ্লে¬ষন করা চলে না। লোক সাহিত্য স্বতঃস্ফুর্ত ও কৃত্রিমতা বর্জিত। বাংলাদেশ লোক সাহিত্য সমৃদ্ধ একটি দেশ। গারো এদেশের একটি উলে¬খযোগ্য জাতিসত্তা সংখ্যায় অল্প হলেও এদের লোক সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

লোক সাহিত্যর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত শাখা হচ্ছে লোক সঙ্গীত। লোক সঙ্গীতের সংজ্ঞা দেয়া কঠিন। তবে ভাব, চিত্র ও কাহিনি অবলম্বনে ছন্দোময় সুরাশ্রিত রচনাকে লোক সঙ্গীত বলা যেতে পারে। জর্জ হারজগ বলেন-ওয়াকিল আহম্মদের মতে লোক সমাজ পুরুষানুক্রমে প্রচলিত ও সুর সংযোগ প্রচারিত রচনা লোক সঙ্গীত।

লোক সঙ্গীত অপেক্ষা জনপ্রিয় সঙ্গীত বাংলা সাহিত্যেই শুধু নয়। বিশ্ব সাহিত্যেও নেই। কারণ এ সঙ্গীতে আছে গনমনের অকপট অভিব্যক্তি। এ অভিব্যক্তির আবেদন অত্যন্ত গভীর ও হৃদয় গ্রাহী। এতে আছে সরল স্বাভাবিক জীবনের মনোরম আলোক আর আদর সোহাগের অনুপম মাধুর্য্য। লোক সাহিত্যর সকল বিষয়ের মত লোক সঙ্গীতও মৌখিত সাহিত্য এবং সংহত সমাজের সামাজিক সৃষ্টি। এর লিখিত কোন রূপ নেই। পল্লিবাসীর মুখে মুখেই এর রচনা, মুখে মুখেই এর প্রচার এবং কেবলমাত্র তাদের স্মৃতিতেই এর অবস্থান। অনুভূতি এদের জনক।

লোক সঙ্গীত চিয়ারত সঙ্গীত। এ সঙ্গীতে আছে মাটির মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। সঙ্গীত চর্চায় গারোদের অতীত ঐতিহ্য রয়েছে। তাদের প্রায় সকল ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব অনুস্থানাদিতে সঙ্গীত ও নৃত্যর প্রচলন আছে। গারোদের একটি উল্লেখযোগ্য লোক সঙ্গীত হচ্ছে- রে-রে। এটি মুখস্থ কোন কবিতা বা গান নয়। তাৎক্ষনিক ভাবেই এর কথাগুলো সুর ও ছন্দময় হয়ে ওঠে। এ যেন একে অপরের সাথে আলাপচারিতা। এর জন্য কোন পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। একজন দক্ষ রে-রেকার অনায়াসেই এর মাধ্যমে মনের কথা প্রকাশ করতে পারে। রে-রের নির্দিষ্ট কোনো রচয়িতা বা সুরকার নেই। প্রকৃতি লালিত এ গারো সমাজ প্রাকৃতিক ভাবেই অনাবিল সুর ও ছন্দ পেয়ে এসেছে। সেই নিজস্ব ভাব ধারায় নিজস্ব সংস্কৃতি তারা অনায়াসে ফুটিয়ে তুলতে পারে এই রে-রের মাধ্যমে।

ছবি : নিগূঢ় ম্রং

আরো লেখা

https://thokbirim.com/2020/08/16/%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be/

https://thokbirim.com/2020/08/13/%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a3%e0%a7%87-%e0%a6%90%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8/




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x